নিভৃতবাস
মানুষ কে তার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়াই সবচেয়ে সহজ এবং অহিংস শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বলে এতকাল জানা ছিল। কালের নিয়মে তা শাস্তি থেকে আশীর্বাদে পরিণত হয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকাই এখন একমাত্র জীবনদায়ী উপায়। তবে সব সময় বিচ্ছিন্ন থেকে, আর ঘর থেকে না বেরিয়েই যে সব সমস্যা এড়ানো যাচ্ছে তা নয়। বয়স্ক বাবা মাকে নিয়ে থাকতে হয় বলে নিজের গতিবিধি অত্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রাখে সেঁজুতি। বড় প্রতিষ্ঠানের বড় দায়িত্ব সামলাতে হয় ঠিকই তবু যতটা সম্ভব বাড়ি থেকেই সামলায়। বছর খানেক ধরে সবাইকে বাড়িতে রেখে, নিজে হাতে সবটা সামলেও শেষরক্ষা করতে পারল না সেঁজুতি। কোনওভাবে ফাঁক ফোকড় গলে অবাঞ্ছিত অতিথির মত অসুখটা ঢুকেই পড়ল তার পরিবারে। জীবনের নানা ওঠাপড়া কে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘ ৫৩ বছর একসাথে আছে সমীর আর হৈমন্তী। সেঁজুতি তাদের একমাত্র শিবরাত্রির সলতে। সংসারের রণক্ষেত্রে অর্জুন আর চিত্রাঙ্গদা দুটি চরিত্রেই সেঁজুতি সমান পারদর্শী।
সেদিন বিকেল থেকে সমীরের শরীরটা ম্যাজ ম্যাজ করছে, গায়ে জ্বর, আরও অনেক রকম অস্বস্তি। কপালে ভাঁজ পড়ল সেঁজুতির। তাহলে কি আর ঠেকানো গেল না! একটা দিন দেখা যাক ঘরোয়া ওষুধে। না পরিস্থিতি অনুকুল নয়। কর্মসূত্রে সেঁজুতির শুভানুধ্যায়ীর সংখ্যা নেহাত কম নয়। নিজের চিন্তার কথা জানাতেই তেমনই একজন সমস্ত রকম যোগাযোগ করে দিলেন। শুরু হল সমীরের চিকিৎসা। এক অভিনব সে চিকিৎসা পদ্ধতি। ডাক্তার আর রুগী পরস্পরকে দেখতে পাবে না। চিকিৎসা হবে শুধুমাত্র মধ্যস্থতাকারীর দেওয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে। এ এক দারুণ গুরুদায়িত্ব। ভয় বিষয়টার সাথে সেঁজুতির খুব একটা সখ্যতা নেই। তবে এত রকম গুরুদায়িত্ব, সবটা ঠিকমত চালিয়ে নিয়ে যাওয়া, সব মিলিয়ে একটু উদ্বিগ্ন তো বটেই। ডাক্তারের পরামর্শ মত সমস্ত ওষুধ পত্র আনুষঙ্গিক আরও সব কিছু যোগাড় করা, সমস্ত রকম পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যবস্থা করার পর বাবা কে নিভৃতবাসে পাঠাল সেঁজুতি। কিন্তু সে নিভৃতবাসে সেঁজুতির প্রবেশ অবারিত। ডাক্তার যদিও অনেক রকম সাবধানতা বজায় রাখতে বলেছিলেন, কিন্তু রণক্ষেত্রে নেমে সেঁজুতি বুঝতে পারে ভাবের ঘরে চুরি করে লাভ নেই। যা হওয়ার তা পরে হবে, আগে তো ছুটে আসা গোলাটার মোকাবিলা করা যাক।
ডাক্তারি পরিভাষায় সমীরের অনেক কোমর্বিডিটি। তাই রোগের বাড়াবাড়ি হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা। ছোটবেলায় জামাকাপড়ে লাগানোর ক্লিপ আঙুলে লাগিয়ে রাখা একটা মজার খেলা ছিল। সেই খেলার স্মৃতি যেন উস্কে দিল তেমনই এক ক্লিপ - পালস অক্সিমিটার। প্রতি মুহুর্তের প্রাণবায়ুর হিসাবরক্ষক। একদিন পর থেকেই হিসাবরক্ষক জানাতে লাগল আয় আর ব্যায়ের মধ্যে ঠিক সঙ্গত হচ্ছে না। বেলুনের গায়ে ছোট্ট ফুটো থাকলে বেলুন টা যেমন আস্তে আস্তে চুপসে যেতে থাকে, সেভাবেই অক্সিমিটারের নিম্নগতি নিস্তেজ করে দিতে লাগল সমীর কে। ডাক্তারের পরামর্শে হৈমন্তীর উপর কড়া ফরমান জারি হয়েছে। কোনওভাবেই তার সমীরের কাছাকাছি যাওয়া চলবে না। অগত্যা মেয়ের কড়া নজরদারি এড়িয়ে মাঝে মাঝে দরজার বাইরে থেকে একদৃষ্টে হৈমন্তী তাকিয়ে থাকে নিস্তেজ মানুষটার দিকে। দু চোখে অনেক জিজ্ঞাসা, উৎকণ্ঠা । কিন্তু কুল ছাপাতে পারে না পাছে মেয়ে রাগ করে! সেঁজুতি ঈশ্বর বিশ্বাসী। জগদীশ্বরের উপর অগাধ আস্থা রেখে লড়াই করে চলে সে। যেমন করে হোক এই ক্লিপ টা কে থামাতে হবে। সারাদিন ঘন্টায় ঘন্টায় বাবাকে ব্যায়াম করানো, বিভিন্ন অবস্থানে শোয়ানো, খাওয়ানো, ওষুধ দেওয়া সবটা যন্ত্রের মত করে চলার ওই ক্লিপ টা যখন কিছুতেই বাগে আসে না, তখন ঈশ্বরের দারস্থ হয় সেঁজুতি। ডাক্তার বলেন অক্সিজেন যোগাড় করে রাখুন যে কোন মুহুর্তে লাগতে পারে। অক্সিজেন! সে তো এখন আকাশের চাঁদের থেকেও মহার্ঘ। আবার করুণাময় পথ দেখান। আবার পাশে এসে দাঁড়ায় এক শুভানুধ্যায়ী। সেঁজুতির দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, অক্সিজেন ছাড়াই সে তার বাবা কে সুস্থ রাখবে। প্রবল কালবৈশাখীর মধ্যে ঘাড়ে করে অক্সিজেন পৌঁছে দেয় এক দেবদূত। সেঁজুতি তার বাবাকে বলে দেখ তোমার তো এখনও শ্বাসকষ্ট নেই। এসো আমরা দুজন মিলে চেষ্টা করি এটা একজন মুমুর্ষু মানুষের জন্য বাঁচিয়ে রাখতে। মেয়ের কথায় কি মনে হয় সমীর ও লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে। সারাদিন অক্লান্ত লড়াইয়ের পর সারারাত ঈষ্টনাম জপ করে চলে সেঁজুতি। বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার ফলাফল ক্রমশঃ অবনতির বার্তাই বয়ে আনতে থাকে। এরই মধ্যে লড়ে চলে সেঁজুতি। কাজের জায়গায় সমস্ত দায়িত্ব পালন, বেশি লোক জানিয়ে সহানুভুতি না নেওয়ার অদম্য প্রচেষ্টা,সব টাই ঠিক ঠাক চলে। সমস্ত আগল হারিয়ে যায় মার সামনে দাঁড়াতে। নিস্তব্ধ পাথরের মত হাত পা মুড়ে বসে থাকা হৈমন্তী শুধু একটাই প্রশ্ন করে মেয়ে কে - তোর বাবার কি হল বল তো! এ প্রশ্নের উত্তর দিতে ডাহা ফেল করে যায় সেঁজুতি। চোখ রাখতে পারে না মায়ের চোখে। শুধু আড়াল থেকে দেখে আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখের জল মুছছে হৈমন্তী। খুব সন্তর্পণে।
একটা ছোট্ট ক্লিপের সাথে লড়াই করতে করতে অবশেষে আশার আলো দেখা যায় ন'দিনের মাথায়। ডাক্তার বলেন ওনার অবস্থা আগের থেকে অনেকটাই ভালো। বাবাকে সুখবর টা জানিয়ে অনেক কিছু শোনার আশায় বাবার পাশে দাঁড়ায় সেঁজুতি। অশক্ত কন্ঠে সমীর জিজ্ঞাসা করে - মা ওষুধ খেয়েছে! সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যায় সেঁজুতির। রোগের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে এ কোন যন্ত্রণায় ঠেলে দেওয়া হয় মানুষগুলোকে! এ কেমন সুস্থ হওয়ার ব্যবস্থা! এগারো টা দিন কেটে গেল। ডাক্তার বললেন এবার উনি নিজের ঘর থেকে বেরোতে পারেন, আপনারা ও সবাই যেতে পারেন। হৈমন্তীর তখনও দ্বিধা কাটে নি। দরজার বাইরে থেকে উঁকি মেরে দেখতে থাকে কেমন আছে মানুষটা। সেঁজুতি ঝিমিয়ে থাকা বাবা কে ঠেলে দিয়ে বলে ওই দেখ মা এসেছে। সমীর ঘাড় ঘুরিয়ে কোনওরকমে চোখটা খুলে তাকায় হৈমন্তীর দিকে। বড় অসহায় সে দৃষ্টি। ক্ষীণ কন্ঠে প্রায় ইশারায় কছে ডাকে হৈমন্তী কে। প্রবল আকুতি নিয়ে বলে - আমার বুকটায় একটু হাত বুলিয়ে দেবে!
ঘর থেকে বেরিয়ে যায় সেঁজুতি। মনে মনে বোধহয় একটু অভিমান হয় তার। এ কদিন ধরে বাবার সমস্ত কষ্ট উপশমের জন্য কম পরিশ্রম তো করে নি সে। পরক্ষণেই চোখ জুড়িয়ে যায় ৫৩ টা বসন্ত পেরিয়ে আসা এই জুটি টা কে দেখে। সত্যিই তো কষ্ট লাঘবের জন্য যতই সেবা করা হোক, তাতে তো ৫৩ বছরের গভীরতা নেই । এই কাছে আসার মধ্যে যে কি রসায়ন লুকিয়ে আছে তা শত চেষ্টা করলেও সেঁজুতি বুঝবে না। বুঝবে না কারণ সেঁজুতি জীবনে অনেক কিছু পেয়েছে, মান সম্মান, অর্থ, প্রতিপত্তি অনেক কিছু। কিন্তু তার যে সংসার করার অভিজ্ঞতা নেই।
Osadharon lekhoni...ei oshanto samay , ei chitro amader moton bohu manush er e bodhoy porichito..tai "sob choritro kalponik", seta bolte parlam na...! Hridoy chhuNye gelo ...etukui bolte pari...🙏
ReplyDeleteShampa
Opurbo laglo. Thik ki bolbo bujhtei parchina. Mon ,pran chhuyee galo. Somporko gulo je ki modhur, ta koto sudhor kore baktoe korechen. Ami amar baba mar somporko o amon ii dekhechi. Apna rSobder chobi chokher samne basche. Ekta kotha mone holo. Amrao ki ek ek jon nijher jaigai sejuti noi? Songsar thakuk , ar nai ba thakuk. Nijheke dekhte pelam je ami. Amon sundoor lekha, thamaben na, likhte thakun ar amra porte thaki.
ReplyDelete